দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে চীন ও রাশিয়া। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করা যেকোনো দেশকে আর্থিকভাবে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে ইরানের দুই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান ব্যয়বহুল সংঘাতের ছয় মাসের মাথায় ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণার পাশাপাশি দেশটিকে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দেন। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর একাধিক বাণিজ্যযুদ্ধের পর এবার পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করতে চাইছেন তিনি।
তবে কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, ট্রাম্পের এই চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনা কার্যকর করা খুবই কঠিন হবে।
তিনি বলেন, সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা আরোপে সাধারণত বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। ট্রাম্প এককভাবে সেই ধরনের সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাইছেন। এতে চীন, রাশিয়া এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
গত মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার প্রচারণা হবে ‘কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’। একই সঙ্গে ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সহায়তাকারী দেশগুলোর জন্য ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির’ হুমকি দেন তিনি।
তেল পাচার, বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন, নগদ অর্থ স্থানান্তর, অর্থ বিনিময় প্রতিষ্ঠান, জাহাজ নিবন্ধন ও আড়ালকারী প্রতিষ্ঠানের মতো বিভিন্ন উপায়ে ইরানকে সহায়তা বন্ধ করার আহ্বান জানান ট্রাম্প।
একই দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাত অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অবরোধের ঘোষণা দেয়। ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের ভূখণ্ডে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে অভিযোগ করে এই সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি। ব্র্যান্ডাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাদের হাবিবি মনে করেন, এই বাণিজ্য অবরোধ আরোপে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যুক্তরাষ্ট্র জোরালোভাবে উৎসাহিত বা প্রভাবিত করেছে। ওয়াশিংটন ইরানের অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদার, বিশেষ করে সবচেয়ে বড় অংশীদার চীনের ওপরও চাপ বাড়াতে পারে বলে ধারণা তার।
তবে চীন ও ইরানের বাণিজ্য সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া ইরানি তেলের ৮০ শতাংশ কিনেছে চীন।
চীনের অনেক তেল শোধনাগার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা কম। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন। অন্যদিকে, ইরানি অর্থ লেনদেনে জড়িত থাকার কারণে বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে চীনের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে সংবেদনশীল কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে এতে বেইজিংয়ের পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকিও রয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের চীন ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জি মনে করেন, ইরানের অর্থনৈতিক মিত্রদের লক্ষ্য করে ট্রাম্পের হুমকি চীনের সঙ্গে ইরানের বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক পরিবর্তন করতে পারবে না।
তার ভাষ্য, ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চান, আর বেইজিংও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সাময়িক সমঝোতা বজায় রাখতে আগ্রহী।
পল মাসগ্রেভ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যদি আগ্রাসীভাবে গৌণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এক ধরনের অর্থনৈতিক শীতল যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। তাই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাইবেন না বলেও তিনি মনে করেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ানও বলেছেন, আরও নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে না। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া চলতি বছর দুই নেতার আরও দুটি সম্ভাব্য বৈঠক হতে পারে। ইউ জি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দুই পক্ষের আলোচনার একটি বিষয় হবে, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে না।
অন্যদিকে, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চীনের তুলনায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যের পরিমাণ কম হলেও দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে মস্কো ও তেহরান গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এই দুই দেশ ২০ বছরের অংশীদারত্ব চুক্তি করে। রুশ জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই সিভিলেভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের পাশাপাশি রাশিয়া ও ইরান কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামও আদান-প্রদান করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গত সোমবার এনবিসি নিউজ একটি ইউরোপীয় সরকারের নথির বরাত দিয়ে জানায়, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি পাঠিয়েছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকেই মস্কো বড় অংশের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বুধবার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক প্রচারণার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি ওয়াশিংটনের ‘ব্যর্থ নীতির’ ধারাবাহিকতা এবং এর ফল হবে ‘আরও পরাজয়’।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
চীন, রাশিয়া, ভারত ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তিকে নিয়ে গঠিত ব্রিকসের সদস্য হিসেবে ইরান পশ্চিমা বাজারের বাইরে নতুন আর্থিক পথ খুঁজছে। গত সপ্তাহে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি জানান, ব্রিকসের নতুন উন্নয়ন ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে তেহরান। এতে পশ্চিমা বাজারের বাইরে অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ রয়েছে বলে ইরান মনে করে। এ ছাড়া অন্যান্য সদস্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় মুদ্রা সহযোগিতার বিষয়েও ভাবছে তেহরান।
তবে ইরানের সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে নতুন উন্নয়ন ব্যাংক এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। সদস্য হতে হলে ইরানকে আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
তেহরানের কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্রের বিশ্লেষক আলি আকবর দারেইনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে।
তার ভাষ্য, ‘ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে গেছেন, যেখানে তিনি জিততেও পারছেন না, আবার বেরিয়েও আসতে পারছেন না।’
/অ